শুক্রবার, ১৮ জুন ২০২১, ০২:৫৮ পূর্বাহ্ন

গুম খুন আর লুটপাটের হোতা বাংলাদেশের শাসক পরিবার: সেনাপ্রধানের চাঞ্চল্যকর তথ্য

নিউজ ডেস্কঃ
  • Update Time : বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২০
  • ২৩৩ Time View

বাংলাদেশে যত গুম খুন এবং লুটপাট হচ্ছে, সে গুলোর সাথে শাসক পরিবারের সরাসরি জড়িত থাকার চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছেন বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ। সেনাপ্রধানের সাথে তাঁর বন্ধু এবং কোর্সমেট কর্নেল (অব:) শহিদ উদ্দিন খানের টেলিকথোপকথন আজ এক ইউটিউব চ্যানেলে (পলিটিকো বিডি নিউজ) প্রচারিত হয়েছে। ইউটিউবের ওই অনুষ্ঠানে অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল শহিদ উপস্থাপকের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর প্রদান করেন। অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল শহিদ সেনাপ্রধানের সাথে তাঁর কথোপকথন এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয় মেজর জেনারেল (অব:) তারেক সিদ্দিকীর সঙ্গে ব্যবসায়িক লেনদেনের বিস্তারিত বর্ণনা দেন। উপস্থাপকের প্রশ্নের জবাবে মেজর জেনারেল (অব:) সিদ্দিকীর স্ত্রীর মাধ্যমে সামরিক বাহিনীসহ অন্যান্য সরকারি খাতের ব্যবসা কিভাবে শাসক পরিবার হাতিয়ে নিচ্ছেন তারও বিবরণ উঠে আসে। এই সমস্ত অপকর্মে যে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সায় রয়েছে সেটাও সেনাপ্রধানের বক্তব্য থেকে প্রমাণিত হয়েছে।

তারেক সিদ্দিকীর নিয়ন্ত্রণে জিয়াউল আহসান কর্তৃক গুম খুন

বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভিন্নমত এবং বিরোধী রাজনৈতিক দল দমন করবার জন্য মানুষ গুম করার মত জঘন্যতম মানবতাবিরোধী অপরাধ নিয়মিত সংঘটিত হচ্ছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়িক প্রতিপক্ষ পর্যন্ত গুমের ঘটনা ঘটছে অহরহ। টেলি-কথোপকথনে সেনাপ্রধান আজিজের মুখে প্রকাশ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী প্রতিটি গুম ও গুপ্ত খুনের সাথে জড়িত শেখ হাসিনার উপদেষ্টা তারেক সিদ্দিকী। কথোপকথনে প্রসঙ্গক্রমে জেনারেল আজিজ তাঁর বন্ধুকে উদ্দেশ্য করে বলেন-“দোস্ত আমি যখন কথা বলতে চাই, ওইখানে (প্রধানমন্ত্রীর) কিন্তু তোর অবস্থা খুব একটা ভাল না। তোর সম্পর্কে ইম্প্রেশনটা ভাল না। আমি আর এটা নিয়ে ডিটেইলস কথা বলতে চাই না। বুঝছিস দোস্ত। আমাকে তো কথা বলতে হবে নট এজ এ কোর্সমেট। নিরপেক্ষ হিসাবে, এখানে সেনাপ্রধান হিসাবে। আমি কিন্তু ওই কথাটা বলেছি, কিন্তু খুব একটা, তোর ব্যাপারে ভাল ইম্প্রেশন পাইনি। সেজন্য ওইদিন থেকে হল যে, ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড। এজন্য হইছে কি, এ গুলো সবাই জানেন, কে কি করতেছে না করতেছে, ওয়াইফ (তারেক সিদ্দিকীর স্ত্রী) কি করতেছে না করতেছে। কিন্তু তারপরও তোরে যাদের কথা বলছি, ওরা সবাই তাঁর অনুগত। এরা ভাবে যে ‘ও’ (তারেক সিদ্দিকী) যদি বিগরাই যায় তো কেউ থাকতে পারবে না (অর্থাৎ চাকুরীতে থাকতে পারবে না)। জিনিসটা যেহেতু হইয়াই গেছেগা, এটা নিয়াই মানে এটা নিয়াই থাকতে হবে। এটা মাথায় রাখতে হবে। ঠিক আছে না দোস্ত। এখন যেই জিনিসটা হল, তার যে কিছু কিছু জিনিস আছে, এইটা হল খুব স্ট্রং। আমাদের এই টুলস গুলো নাই। যেমন হল যে, তাঁর জিয়া (জেনারেল জিয়াউল আহসান)। জিয়া হল যে যত কুকীর্তি আছে, জিয়া আর জোবায়ের, এই দুইজনকে দিয়া তাঁর (তারেক সিদ্দিকীর) যত কুকীর্তি আছে করায়। জিনিসটা বুঝছোস তো। আমি এতটুকুই বলব। আর বেশিকিছু বলব না।”

অপরপ্রান্ত থেকে কর্নেল (অব:) শহিদ খান তখন বলেন, “জিয়াকে দিয়া তো এগুলো আগে থেকেই করছে।” সেনাপ্রধান আজিজ তখন বলেন, “এখনো করায়। দোস্ত এখনো করায়। এই যে গুম থেকে শুরু করে এ গুলা আসলে, আমাকে কিন্তু আমাকে আবেদীন অনেকবার বলছে, স্যার এগুলো জিয়া করে। সব জিয়াকে দিয়ে করায়। আমি কিন্তু জিয়াকে চেইঞ্জ করার জন্য প্রপোজাল নিয়া গেছিলাম একদম ওপরে। কিন্তু রাজি হয় নাই। করে নাই। দোস্ত বুঝছিস চাইলেই কিন্তু অনেক কিছু হয় না।”

এই কথোপকথন থেকে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে যে, বাংলাদেশে সকল গুম খুনের হোতা তারেক সিদ্দিকী এবং জিয়াউল আহসান। এবং তাদের এই মানবতাবিরোধী অপরাধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্পূর্ণ সায় রয়েছে।

এনটিএমসি
সেনাপ্রধানের কাছে তার বন্ধু কর্নেল অব শহিদ “এনটিএমসি কি” জানতে চাইলে সেনাপ্রধান তখন বলেন, “এনটিএমসি হল, ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন সেল। এইটা হল যত রকমের টেলিফোন, হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার রয়েছে যা দিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা করা হয়, কি করতেছে, না করতেছে, কাকে ব্লক করা, সব করে এনটিএমসি।”
অপরপ্রান্ত থেকে তখন আরো জানতে চাওয়া হয়, “এই সংস্থাটি কার আন্ডারে।” সেনাপ্রধান তখন জানান, “এটা হোম মিনিস্টারের আন্ডারে। তবে হোম মিনিস্টারের আন্ডারে হলেও জিটি (জেনারেল তারেক সিদ্দিকী) কন্ট্রোল করে। একেবারে হান্ড্রেড পার্সেন্ট।”

এখানে উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর জিয়াউল আহসানকে র‌্যাবের উপ-প্রধান হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমেও তারেক সিদ্দিকী এবং জিয়াউল আহসান কর্তৃক গুম-খুনের অভিযোগের বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। সেনাপ্রধানের টেলি-কথোপকথন ফাঁস হওয়ার পর এটা নিশ্চিত হওয়া গেল যে, প্রকৃতপক্ষেই জেনারেল জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বে দেশে গুম ও গুপ্ত হত্যা গুলোর ঘটনা ঘটেছে। আর এগুলোর মূল নিয়ন্ত্রক হলেন, শেখ হাসিনার আত্মীয় ও নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারেক সিদ্দিকী। শুধু তাই নয়, সেনা প্রধানের কথায় আরো উঠে এসেছে তারেক সিদ্দিকীকে সন্তুষ্ট না রাখতে পারলে সেনাবাহিনীতে কেউ চাকুরীতে থাকতে পারে না।

হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট
জেনারেল তারেক সিদ্দিকীর স্ত্রী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে কিভাবে বিভিন্ন ব্যবসা হাতিয়ে নিচ্ছেন তার বর্ণনাও এই টেলি-কথোপকথনে আমরা শুনতে পেরেছি। ক্ষমতাসীনদের আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে হাজারো কোটি টাকা কিভাবে ভাগ বাটোয়ারা হয় সেটা উঠে এসেছে এই টেলিকথোপকথনের বর্ণনায়। আরো উঠে এসেছে তারেক সিদ্দিকীর স্ত্রী কিভাবে বিভিন্ন ব্যবসা হাতিয়ে নিচ্ছেন। ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যবসায়ীক পার্টনারের বাড়িতে পুলিশ দিয়ে অভিযান চালিয়েছেন। কথোপকথনে উঠে এসেছে শত কোটি টাকার লেন-দেনের হিসাব নিয়ে।

তারেক সিদ্দিকীর স্ত্রী মূলধন ছাড়াই প্রভাব খাটিয়ে অন্যের ব্যবসায় অর্ধেক মালিকানা নেন। বন্ধু কর্নেল (অবঃ) শহিদ খানের টেলি-কথোপকথনে সেনাপ্রধানকে জানান যে, তিনি কোন পুঁজি ছাড়াই ব্যবসার অর্ধেক মালিকানা তারেক সিদ্দিকীর স্ত্রীকে দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর পুরো ব্যবসাই দখলে নিয়ে নেন তারেক সিদ্দিকীর স্ত্রী। বিরোধের জের ধরে এক সময়ে তারেক সিদ্দিকীর ঘনিষ্ঠ শহিদ খান ব্যবসা হারিয়ে বিদেশে পাড়ি জমাতে হয়। বাংলাদেশ সরকারের উচ্চ মহলের মদদে পরিবারসহ কর্নেল শহিদকে ইন্টারপোলের রেড এলার্ট দেয়া হয়েছিল এটাও উঠে আসে তাদের কথোপকথনে। এমনকি শহিদ খান অভিযোগ করছেন, অস্তিত্বহীন জমি দখলের অভিযোগ এনে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হয়েছে। যে জমির কোন অস্তিত্ব বাস্তবে নেই। সেই বানোয়াট মামলায় তাঁকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ডও দেয়া হয়েছে।

(অবঃ) কর্নেল শহিদ বলেন যে, তারেক সিদ্দিকীর সাথে মিলে সস্তায় ঝামেলাযুক্ত জমি কিনে সেটাকে সরকারি প্রভাব খাটিয়ে ঝামেলামুক্ত করে বেশি দামে বিক্রি করতেন। এই কোম্পানিতে তারেক সিদ্দিকীর স্ত্রী এবং কর্নেল শহিদের স্ত্রী ৫০/৫০ পার্টনার ছিলেন। কর্নেল শহিদ উদ্দিন খানের সাথে বিরোধের সূত্র ধরে তাদের কোম্পানিতে কর্মরত কয়েকজনকে গুম করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এরমধ্যে ক্যাপ্টেন জহুর নামক একজনকে ২০১৯ সালে মেরে ফেলা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেছেন।

কর্নেল শহিদের বর্ণনা অনুযায়ী গুম-খুনের শিকার ক্যাপ্টেন জহুরের ছেলে সেনাবাহিনীতে কর্মরত একজন মেজর। সেই মেজর ছেলেও এখন পর্যন্ত পিতার গুমের বিচার পান নাই।
কর্নেল শহিদ আলোচনায় আরো উল্লেখ করেন, ২০১৬ সালে তিনি একবার দেশে গিয়েছিলেন। তখন জেনারেল আজিজ এবং জেনারেল নাজিম উদ্দিন রাতে তাঁর বাসায় দেখা করতে আসেন। তারা দুইজনেই আসেন সিভিল ড্রেসে, ব্যক্তিগত গাড়িতে। তিনি উল্লেখ করেন, তারেক সিদ্দিকীর ভয়ে তারা সেনাবাহিনীর গাড়িতে আসেননি। কারণ, তারেক সিদ্দিকীর স্ত্রী শাহিনা সিদ্দিকী দুই জেনারেলকে কর্নেল শহীদের সঙ্গে দেখা করতে নিষেধ করেছিলেন। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে জেনারেল তারেক সিদ্দিকী এবং তাঁর স্ত্রী সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করছেন।

বিগত ১২ বছরের এক দলীয় শাসনে শেখ হাসিনা এক সময়ের সার্বভৌমত্বের প্রতীক বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে একটি আত্মসম্মানহীন দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিগত বাহিনীতে পরিণত করেছেন।
টেলি-কথোপকথনে আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় রয়েছে। সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ তাঁর বন্ধুকে ফোনে বলেন যে, একটি পত্রিকার সম্পাদক তাঁর (জেনারেল আজিজ) সাথে সেনাপ্রধানের দফতরে দেখা করতে এসেছিলেন। তখন তাঁর সাথে আলোচনা প্রসঙ্গে ওই সম্পাদক জানতে চান যে, তিনি দেশের ক্ষমতা নিচ্ছেন কিনা। সেনাপ্রধানের বক্তব্য অনুসারে ওই সম্পাদক তাঁকে পরামর্শ দিয়ে বলেন, “ক্ষমতা দখল করলেও বিএনপি’র হাতে দিয়েন না।”

সেনাপ্রধানের সাথে এই সম্পাদকের আলোচনায় পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে যে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কোন রকমের পেশাদারিত্ব আর অবশিষ্ট নাই। এই বাহিনীর কর্মকর্তারা সবাই ফ্যাসিবাদী সরকার প্রধানের মন যুগিয়ে এবং দিল্লীর কাছে দেশের সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিয়ে বৈধ এবং অবৈধভাবে কেবল নিজেদের সম্পদ বৃদ্ধি করে চলেছেন।

সুত্রঃ আমার দেশ

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
Design & Develop BY Our BD It
© All rights reserved © 2020 adibanglanewsbd
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
themesba-lates1749691102